বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট – SUPREME COURT OF BANGLADESH
বাংলাদেশে সুপ্রিম কোর্টের ইতিহাস মূলত ব্রিটিশ আমলের বিচার ব্যবস্থার সাথে সম্পর্কিত। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর ঢাকায় হাইকোর্ট ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয় এবং ১৯৫১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের হাইকোর্ট হিসেবে এই ভবনের নির্মাণ সম্পন্ন হয়। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পর ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান কার্যকর হওয়ার সাথে সাথে স্বাধীন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বিচারালয় হিসেবে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট তার যাত্রা শুরু করে।
সংবিধান অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্ট মূলত দুটি বিভাগ নিয়ে গঠিতঃ আপিল বিভাগ (Appellate Division) এবং হাইকোর্ট বিভাগ (High Court Division)। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন এই স্বাধীন প্রতিষ্ঠানটি সংবিধান রক্ষা, মৌলিক অধিকার বলবৎ এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করতে প্রধান ভূমিকা পালন করে আসছে।
স্থাপত্যশৈলী ও প্রধান আকর্ষণ
-
নান্দনিক রাজকীয় ভবন: সুপ্রিম কোর্টের মূল ভবনটির স্থাপত্যে ইন্দো-সারাসেনিক বা ইউরোপীয় ও মুঘল স্থাপত্যের মিশ্রণ রয়েছে। সুবিশাল গম্বুজ, উঁচু খিলান এবং চারপাশের লাল-সাদা রঙের সংমিশ্রণ ভবনটিকে দিয়েছে এক রাজকীয় রূপ।
-
বিশাল সবুজ চত্বর: হাইকোর্ট সংলগ্ন পুরো এলাকাটি সুসংগঠিত বাগান, প্রাচীন বৃক্ষরাজী এবং মনোরম হাঁটার পথ দিয়ে ঘেরা, যা প্রাঙ্গণটিকে বেশ শান্ত ও গম্ভীর পরিবেশ প্রদান করে।
-
সুপ্রিম কোর্ট জাদুঘর: এখানে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতের ঐতিহাসিক রায়, স্বাধীনতা-পূর্ব এবং পরবর্তী সময়ের বিচারিক দলিল, ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলের বিরল স্মারক এবং প্রখ্যাত আইনজ্ঞদের ব্যবহৃত নানা সরঞ্জাম সংরক্ষিত রয়েছে।
-
ঐতিহাসিক তোরণ ও কদম ফোয়ারা: সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণের প্রধান ফটক এবং সংলগ্ন কদম ফোয়ারা এলাকাটি ঢাকার অন্যতম দৃষ্টিনন্দন দৃশ্য হিসেবে গণ্য হয়।
গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও বিশেষ পয়েন্ট
-
সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন ভবন: সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণেই অবস্থিত আইনজীবীদের এই নিজস্ব ভবনটি দেশের অন্যতম বৃহত্তম আইনি সংস্থাসমূহের কেন্দ্রবিন্দু।
-
মূল সার্কিট হাউস বা পুরাতন হাইকোর্ট ভবন: সুপ্রিম কোর্টের ঠিক বিপরীত পাশে অবস্থিত এই ঐতিহাসিক দোতলা ভবনটি ব্রিটিশ ও মুঘল ধারায় তৈরি। যা বর্তমানে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় ও প্রশাসনিক কাজে ব্যবহৃত হয়।
-
হাইকোর্ট মাজার শরিফ: সুপ্রিম কোর্ট সীমানার মধ্যেই অবস্থিত হযরত শরফুদ্দিন চিশতী (র:)-এর ঐতিহাসিক মাজার। যা স্থানীয় ভক্তদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র একটি স্থান।
-
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT): সুপ্রিম কোর্ট সংলগ্ন পুরাতন হাইকোর্ট ভবনে ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য গঠিত ট্রাইব্যুনাল অবস্থিত।
-
বিচারিক লাইব্রেরি: এখানে দেশের অন্যতম বৃহত্তম ও সমৃদ্ধ আইনি লাইব্রেরি রয়েছে, যেখানে শতাব্দী প্রাচীন বিরল আইনি নথিপত্র ও রেফারেন্স বই সংগৃহীত আছে।
পরিদর্শনের সময়সূচী ও নিয়মাবলী
যেহেতু এটি দেশের সর্বোচ্চ আদালত এবং একটি স্পর্শকাতর প্রশাসনিক কেন্দ্র, তাই সাধারণ দর্শনার্থীদের ভবনের মূল বিচার কক্ষে প্রবেশের ওপর কড়া নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে আদালতের বাইরের চত্বর, স্থাপত্যশৈলী এবং জাদুঘর দেখার সুযোগ রয়েছে।
-
পরিদর্শনের সময়: সাপ্তাহিক ছুটির দিন (শুক্রবার ও শনিবার) এবং সরকারি ছুটির দিনে সুপ্রিম কোর্টের বাহ্যিক রূপ ও চারপাশের পরিবেশ দেখতে যাওয়া সবচেয়ে সুবিধাজনক।
-
পরামর্শ: প্রাঙ্গণে প্রবেশের সময় নিরাপত্তা তল্লাশি মেনে চলতে হয় এবং মূল আদালত কক্ষে ছবি তোলা বা অপ্রয়োজনীয় জটলা তৈরি করা সম্পূর্ণ নিষেধ।
কিভাবে যাবেন?
ঢাকার যেকোনো স্থান থেকে বাস, সিএনজি বা রাইড শেয়ারিং যোগে খুব সহজেই শাহবাগ, কদম ফোয়ারা বা প্রেস ক্লাব এলাকায় নামলেই সুপ্রিম কোর্ট দেখতে পাবেন। এছাড়া ঢাকা মেট্রোরেলে ভ্রমণ করলে “শাহবাগ মেট্রো স্টেশন“ “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মেট্রো স্টেশন“ বা “বাংলাদেশ সচিবালয় মেট্রো স্টেশন“ স্টেশনে নেমে মাত্র ৫ মিনিট হেঁটে সরাসরি সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে পৌঁছানো যায়।

