জাতীয় সংসদ ভবন – NATIONAL PARLIAMENT BUILDING

জাতীয় সংসদ ভবনের ইতিহাস ষাট দশকের গোড়ার দিকে বিস্তৃত। ১৯৫৯ সালে তৎকালীন পাকিস্তানের দ্বিতীয় রাজধানী হিসেবে ঢাকায় একটি কেন্দ্রীয় পরিষদ ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়। তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম সেরা মার্কিন স্থপতি ও ফিলডেলফিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক লুই আই কান (Louis I. Kahn)-কে এই সুবিশাল প্রকল্পের প্রধান স্থপতি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। ১৯৬৪ সালে প্রায় ৩ কোটি দুই লাখ মার্কিন ডলার প্রাথমিক বাজেটে এর নির্মাণকাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন সময় এর নির্মাণকাজ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। স্বাধীনতার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার এই জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্যের অসম্পূর্ণ কাজ পুনর্নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। নানা রাজনৈতিক পরিবর্তন ও জটিলতা কাটিয়ে ১৯৮২ সালের২৮ জানুয়ারি তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তার আনুষ্ঠানিকভাবে এই আধুনিক স্থাপত্যিক বিস্ময়ের উদ্বোধন করেন। একই বছরের১৫ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় জাতীয় সংসদের অষ্টম (ও শেষ) অধিবেশনে এটি প্রথম ব্যবহৃত হয়।
ঢাকার শেরেবাংলা নগরে প্রায় ২০৮ একর (৮৪.২ হেক্টর) সুবিশাল এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই প্রাঙ্গণটি কেবল মূল ভবনেই সীমাবদ্ধ নয়। পুরো চত্বরটি কয়েকটি প্রধান ব্লকে বিভক্ত—মূল সংসদ ভবন, প্লাজা, দক্ষিণ প্লাজা, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন, সচিবালয় কার্যালয়, অফিসার্স হোস্টেল, বাগান এবং মনোরম কৃত্রিম রদ। লুই কান প্রাচীন রোমান স্থাপত্যের বিশালাকার জ্যামিতিক অবয়ব এবং বাংলার চিরায়ত নদীভিত্তিক প্রকৃতির এক অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটিয়ে এর নকশা সাজিয়েছিলেন। ইট, মার্বেল ও কংক্রিটের নিখুঁত ব্যবহারের মাধ্যমে তৈরি এই স্থাপনাটি ১৯৮৯ সালে বিশ্বের অন্যতম সম্মানজনক স্থাপত্য পুরস্কার ‘আগা খান আর্কিটেকচার অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করে। বর্তমানে এটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য এবং আধুনিক স্থাপত্যশৈলীর এক কালজয়ী প্রতীক।

স্থাপত্যশৈলী ও প্রধান আকর্ষণ

  • জ্যামিতিক নকশা: ভবনের বাইরের দেওয়ালে বৃত্ত, ত্রিভুজ, বর্গক্ষেত্র ও অন্যান্য জ্যামিতিক আকারের সুনিপুণ প্রকাট আলো-ছায়ার এক অদ্ভুত ও মায়াবী খেলা তৈরি করে।
  • লেক ও কৃত্রিম হ্রদ: মূল সংসদ ভবনটিকে ঘিরে রয়েছে কৃত্রিম হ্রদ (Crescent Lake), যা ভবনটির নান্দনিকতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। পানিতে ভবনের ছায়া পড়লে এক অসাধারণ দৃশ্যের অবতারণা ঘটে।
  • বিশাল প্রাঙ্গণ: এর চারপাশের সবুজ চত্বর এবং পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ফুটপাত প্রতিদিন শত শত দর্শনার্থী ও প্রাতঃভ্রমণকারীদের হাঁটার প্রিয় স্থানে পরিণত হয়েছে।

ভ্রমণ ও দর্শনার্থীদের সময়সূচী

নিরাপত্তাজনিত কারণে সাধারণ দর্শনার্থীদের মূল সংসদ ভবনের ভেতরে প্রবেশের অনুমতি নেই (বিশেষ অনুমতি বা সংসদ অধিবেশন দেখা ছাড়া)। তবে ভবনের বাইরের চত্বর, ক্রিসেন্ট লেক এবং চন্দ্রিমা উদ্যান সংলগ্ন এলাকা সর্বসাধারণের জন্য উম্মুক্ত।
  • পরিদর্শনের সেরা সময়: বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সময়টি ঘুরে দেখার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। সন্ধ্যার পর মনোরম আলোকের ফোয়ারা ও আলোকসজ্জা দেখার মতো এক চমৎকার পরিবেশ তৈরি করে।

কিভাবে যাবেন?

ঢাকার যেকোনো প্রান্ত থেকে বাস, সিএনজি বা রাইড শেয়ারিং সার্ভিসের মাধ্যমে সরাসরি শেরেবাংলা নগর (খামারবাড়ি বা আসাদগেট) এসে নামলেই জাতীয় সংসদ ভবন দেখতে পাবেন। এছাড়া ঢাকা মেট্রোরেলের মাধ্যমে “বিজয় সরণি মেট্রো স্টেশন” অথবা “ফার্মগেট মেট্রো স্টেশন সহজে এখানে পৌঁছানো যাবেন।

গুগল ম্যাপস