২০২৪ সালের জুলাই ঐতিহাসিক পটপরিবর্তন ও গণ-অভ্যুত্থান
১. পটভূমি: কোটা আন্দোলন থেকে একদফা দাবি (কেন এবং কীভাবে হয়েছিল) ২০২৪ সালের জুন মাসের শেষভাগ থেকে সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতির বৈষম্য সংস্কারের দাবিতে সাধারণ শিক্ষার্থীরা শান্তিসুলভ আন্দোলন শুরু করে। জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে এই আন্দোলন দমনে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ও তাদের অঙ্গসংগঠনগুলো কঠোর অবস্থান নেয় এবং দেশব্যাপী ইন্টারনেট শাটডাউন ও নজিরবিহীন curfew জারি করা হয়। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে শত শত শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ প্রাণ হারালে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
সাধারণ শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন রূপ নেয় গণ-আন্দোলনে, যা পরবর্তীতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের পদত্যাগের “এক দফা দাবি”-তে পরিণত হয়। ৩রা আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে এই একদফা দাবি ঘোষণার পর, ৪ঠা আগস্ট সারা দেশে তীব্র সংঘাত হয়। এর জের ধরে ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতা ঢাকার অভিমুখে ‘লং টু ঢাকা’ বা ঢাকা চলো কর্মসূচির ডাক দেয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখ লাখ মানুষ সব বাধা ও curfew ভেঙে ঢাকার রাজপথে নেমে আসে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জনজোয়ারের মুখে টিকতে না পেরে ৫ই আগস্ট ২০২৪ তারিখে দুপুর আড়াইটার দিকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং দেশ ত্যাগ করেন।
২. গণভবনে জনতার প্রবেশ: ৫ই আগস্টের নজিরবিহীন ঐতিহাসিক মুহূর্ত শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশ ছাড়ার খবরটি ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথেই ঢাকার রাজপথে থাকা লাখ লাখ উল্লাসিত মানুষ শাহবাগ ও বিজয় সরণি হয়ে গণভবনের দিকে অগ্রসর হয়। বছরের পর বছর ধরে যে গণভবন ছিল দেশের সবচেয়ে সুরক্ষিত ও সাধারণ মানুষের জন্য নিষিদ্ধ এক দুর্গ, কয়েক মিনিটের মধ্যে তার চারপাশের সমস্ত লোহার ব্যারিকেড ও নিরাপত্তা প্রাচীর ভেঙে পড়ে।
দুপুর ৩টার পর গণভবন আক্ষরিক অর্থেই “জনগণের ভবন”-এ পরিণত হয়। হাজার হাজার সাধারণ মানুষ, ছাত্র, নারী ও শিশু গণভবনের মূল ভবনের ভেতরে, বেডরুমে, কনফারেন্স রুমে এবং বিশাল সবুজ চত্বরে ছড়িয়ে পড়ে। দীর্ঘ ১৬ বছরের রাজনৈতিক ক্ষোভ ও শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির অবসান ঘটিয়ে জনতা সেখানে উল্লাসে মেতে ওঠে। অনেকেই গণভবনের ভেতরের সোফা, চেয়ার, খাট, দামি আসবাবপত্র, রান্নাঘরের তৈজসপত্র, এমনকি গণভবনের খামারের হাঁস, মুরগি, মাছ ও উৎপাদিত শাকসবজি পর্যন্ত স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে নিয়ে যেতে শুরু করে। দেওয়ালে দেওয়ালে লেখা হয় বিজয়ের স্লোগান ও গ্রাফিতি। পৃথিবীর ইতিহাসে খুব কম শাসকের বাসভবনেই এমন গণ-নিয়ন্ত্রণের ঘটনা ঘটেছে, যা সেদিন ঢাকাবাসী প্রত্যক্ষ করেছিল।
৩. সবশেষে কী হলো: শান্তিশৃঙ্খলা ও রাষ্ট্রীয় সুরক্ষায় প্রত্যাবর্তন গণভবনে জনসাধারণের এই স্বতঃস্ফূর্ত ও অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশের ফলে ভবনের অভ্যন্তরীণ কাঠামো, নথিপত্র এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। তবে ৫ই আগস্টের পর দেশের সচেতন শিক্ষার্থী ও স্বেচ্ছাসেবীরা গণভবনের নিরাপত্তা রক্ষায় এগিয়ে আসেন এবং লুণ্ঠিত হওয়া অনেক রাষ্ট্রীয় মালামাল ও অর্থ উদ্ধার করে সেনাবাহিনীর কাছে ফেরত দেন।
৮ই আগস্ট ২০২৪ তারিখে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে দেশে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সেনাবাহিনীর যৌথ সহায়তায় গণভবন প্রাঙ্গণটি পুনরায় সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় সুরক্ষায় ও নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়। ভবনের চারপাশের নিরাপত্তা জোরদার করা হয় এবং সাধারণ মানুষের অননুমোদিত প্রবেশ সম্পূর্ণ বন্ধ করে এর ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ ও সংস্কারের কাজ শুরু হয়।