গুলিস্তান শহীদ মতিউর পার্ক – GULISTAN SHAHID MATIUR PARK

গুলিস্তান শহীদ মতিউর পার্ক (যা পূর্বে পার্ক মার্কেট” বা স্থানীয়ভাবে গুলিস্তান পার্ক” নামে পরিচিত ছিল) ঢাকার অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহাসিক বাণিজ্যিক কেন্দ্র গুলিস্তানের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক পার্ক। পুরান ঢাকা ও নতুন ঢাকার সংযোগস্থলে অবস্থিত এই উদ্যানটি ঐতিহ্য, ইতিহাস এবং মেগাসিটির ব্যস্ত বাণিজ্যিক আবহের মাঝে নগরবাসীর জন্য এক টুকরো উন্মুক্ত স্থান হিসেবে পরিচিত।

ইতিহাস ও নামকরণ

পার্কটির নামকরণ করা হয়েছে ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের কিশোর শহীদ মতিউর রহমান মল্লিক-এর স্মরণে। ১৯৬৯ সালের ২৪ জানুয়ারি আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের ঐতিহাসিক আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন নবম শ্রেণীর ছাত্র মতিউর।

মুক্তিযুদ্ধের পর এই বীর শহীদের ত্যাগ ও স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে তৎকালীন গুলিস্তান পার্কের নাম পরিবর্তন করে আনুষ্ঠানিকভাবে “শহীদ মতিউর পার্ক” রাখা হয়। পরবর্তীতে পার্কটির ভেতরে শহীদ মতিউর রহমানের একটি স্মারক স্তম্ভ ও প্রতিকৃতি স্থাপন করা হয়।

অবস্থান ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশ

  • অবস্থান: পার্কটি ঢাকার অন্যতম ব্যস্ততম পয়েন্ট গুলিস্তান জিরো পয়েন্ট (নুর হোসেন চত্বর), জিপিও (GPO), বঙ্গবন্ধু এভিনিউ এবং বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের ঠিক সংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত।

  • চারপাশের পরিবেশ: পার্কটির চারপাশ ঘিরে রয়েছে দেশের অন্যতম বৃহৎ পাইকারি ও খুচরা বাণিজ্যিক হাব। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম, পাতাল মার্কেট, এবং ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনাল। শত শত দোকানপাট ও হাজার হাজার পথচারীর ব্যস্ত কোলাহলের ঠিক মাঝখানেই পার্কটির অবস্থান।

প্রধান আকর্ষণ ও অবকাঠামো

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন-এর নান্দনিক আধুনিকায়ন প্রকল্পের আওতায় শহীদ মতিউর পার্ককে আধুনিক নাগরিক সুবিধায় সজ্জিত করা হয়েছে।

  • শহীদ মতিউর স্মৃতিস্তম্ভ: পার্কের অভ্যন্তরে শহীদ মতিউরের স্মরণে নির্মিত সুদৃশ্য স্মারক কাঠামো ও তথ্যফলক রয়েছে। যা আগত দর্শনার্থী ও নতুন প্রজন্মকে দেশের ইতিহাস সম্পর্কে ধারণা দেয়।

  • বিশাল লেক ও বাঁধানো পাড়: পার্কের ঠিক মাঝখানে রয়েছে একটি বিস্তীর্ণ জলাশয় বা লেক। লেকের পাড় বাঁধানো এবং চারপাশে হাঁটার জন্য সুসংগঠিত ওয়াকওয়ে তৈরি করা হয়েছে।

  • ওপেন এয়ার জিম ও ব্যায়ামাগার: স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রাতঃভ্রমণকারীদের জন্য পার্কের ভেতরে উন্মুক্ত জিমনেসিয়াম সরঞ্জাম স্থাপন করা হয়েছে। যেখানে সকালে ও বিকেলে অনেকে শারীরিক কসরত করেন।

  • সবুজায়ন ও বসার বেঞ্চ: পার্কের ভেতরে নানারকম ছায়াদার গাছপালা, সবুজ ঘাসের লন এবং দর্শনার্থীদের বিশ্রামের জন্য আধুনিক বসার বেঞ্চ ও ছাতা নির্মাণ করা হয়েছে।

  • নিরাপত্তা ও আলোকসজ্জা: রাতে পার্কের সৌন্দর্য বৃদ্ধি ও অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে আধুনিক এলইডি লাইটিং ও সিসিটিভি ক্যামেরার ব্যবস্থা রয়েছে।

নাগরিক জীবনে পার্কের ভূমিকা

  • পথচারী ও ব্যবসায়ীদের বিশ্রামস্থল: গুলিস্তান ও মতিঝিল এলাকার ব্যস্ততম কেনাকাটা বা দাপ্তরিক কাজে আসা মানুষ এবং স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা কাজের ফাঁকে একটু জিরিয়ে নিতে এই পার্কে আসেন।

  • প্রাতঃভ্রমণ: গুলিস্তান, সিদ্দিকবাজার, জিরো পয়েন্ট ও পল্টন এলাকার স্থানীয় বাসিন্দারা ভোরে ও বিকেলে এই পার্কে নিয়মিত হাঁটাহাঁটি ও ব্যায়াম করতে আসেন।

পরিদর্শনের সময়সূচী ও নিয়মাবলী

  • খোলা থাকার সময়: পার্কটি প্রতিদিন সকাল ৬:০০ টা থেকে রাত ৯:০০ টা পর্যন্ত জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকে।
  • প্রবেশ ফি: পার্কে প্রবেশ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে

কিভাবে যাবেন?

ঢাকার যেকোনো এলাকা থেকে গুলিস্তান শহীদ মতিউর পার্কে পৌঁছানো অত্যন্ত সহজ।
  • বাস/সিএনজি: ঢাকার প্রায় যেকোনো রুট থেকে গুলিস্তান, জিপিও বা ফুলবাড়িয়াগামী বাসে উঠলে সরাসরি পার্কের সামনে বা জিরো পয়েন্টে নামা যায়।
  • মেট্রোরেল (সবচেয়ে সহজ উপায়): ঢাকা মেট্রোরেলে ভ্রমণ করে সরাসরি “বাংলাদেশ সচিবালয় মেট্রোরেল স্টেশন অথবা “মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশন নেমে হেঁটে মাত্র ৩-৫ মিনিটে সরাসরি গুলিস্তান শহীদ মতিউর পার্কে পৌঁছানো সম্ভব।

গুগল ম্যাপস