শহীদ জিয়া শিশু পার্ক – SHAHEED ZIA CHILDREN PARK

বাংলাদেশের প্রতিটি ঢাকাবাসীর শৈশবের স্মৃতি বিজড়িত এক ভালোবাসার নাম “শহীদ জিয়া শিশু পার্ক”। রাজধানী ঢাকার শাহবাগে অবস্থিত এই পার্কটি ছিল বাংলাদেশের প্রথম আধুনিক সরকারি শিশু পার্ক। ১৯৭৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই উদ্যানটি দীর্ঘ চার দশক ধরে কোটি শিশু ও তাদের অভিভাবকদের অনাবিল আনন্দের খোরাক জুগিয়েছে।
চমৎকার সবুজ গাছপালায় ঘেরা প্রাঙ্গণ, চাকার দোলনা, মিনি ট্রেন এবং ফাইটার জেটের রাইডগুলো একসময় শিশুদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল। বর্তমানে ঐতিহ্যবাহী এই পার্কটিকে আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক রূপ দিতে বিশাল এক উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চলছে।

পার্কের ইতিহাস ও বর্তমান অবস্থা (সংক্ষিপ্ত)

  • ইতিহাস: ১৯৭৯ সালে তৎকালীন সরকারের উদ্যোগে পর্যটন কর্পোরেশনের অধীনে শাহবাগের প্রায় ১৯ একর জমির ওপর এই পার্কটি নির্মাণ করা হয়। ১৯৮৩ সালে এটি বিনোদনের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মুক্ত করা হয় এবং পরবর্তীতে পরিচালন ভার ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (DSCC) হাতে ন্যস্ত করা হয়।
  • বর্তমান অবস্থা: মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন “সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণ (৩য় পর্যায়)” প্রকল্পের অধীনে পার্কটির আধুনিকায়নের কাজ চলছে। পার্কটিকে বিশ্বমানের থিম পার্কে রূপান্তর, মাটির নিচে সুবিশাল পার্কিং এরিয়া নির্মাণ এবং একদম নতুন প্রযুক্তির আধুনিক রাইড স্থাপনের জন্য ২০১৯ সাল থেকে পার্কটির স্বাভাবিক কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। কাজ শেষ হলে এটি একদম নতুন ও আকর্ষণীয় রূপে পুনরায় জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হবে।

মৌলিক তথ্য

  • অবস্থান: শাহবাগ মোড় (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্নিকটে), ঢাকা।

  • আয়তন: প্রায় ১৯ একর।

  • ব্যবস্থাপনা: ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (DSCC)।

  • প্রধান বৈশিষ্ট্য: শিশুদের বিনোদনের পাশাপাশি একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস ও স্মৃতির সাথে পার্কটি ঐতিহাসিকভাবে যুক্ত।

রাইডগুলোর সংক্ষিপ্ত তালিকা

পার্কটি বন্ধ হওয়ার পূর্বে শিশুদের মাঝে জনপ্রিয় যেসব রাইড চালু ছিল এবং নতুন প্রকল্পে যেসব আধুনিক রাইডের সংযোজন ঘটছে।
  • মিনি ট্রেন (Mini Train): পার্কের চারপাশ ঘুরে দেখার ঐতিহ্যবাহী ছোট ট্রেন।
  • রোলার কোস্টার (Roller Coaster): থ্রিল বা রোমাঞ্চ পছন্দ করা শিশুদের প্রিয় রাইড।
  • মিরর হাউজ (Mirror House): আয়নার বিভ্রান্তিকর ও মজার দুনিয়া।
  • ওয়ান্ডার হুইল (Nagordola/Ferris Wheel): উঁচুতে উঠে পুরো পার্ক দেখার চাকা।
  • ফাইটার জেট ও হেলিকপ্টার রাইড: আসল যুদ্ধবিমানের আদলে তৈরি ডাইনামিক রাইড।
  • মেরি-গো-রাউন্ড (Merry-Go-Round): ছোট শিশুদের জন্য ঘোড়ার রাইড।
  • নতুন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে এখানে যোগ হচ্ছে আধুনিক এয়ার বোট, থ্রি-ডি ও ফোর-ডি থিয়েটার এবং সর্বাধুনিক থিম পার্ক রাইডস।

গুরুত্ব ও প্রতীকী তাৎপর্য

শাহবাগ শিশু পার্ক কেবল শিশুদের রাইডে চড়ার স্থান নয়। এটি ঢাকার নগর সংস্কৃতির একটি ঐতিহাসিক স্তম্ভ। মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য নামমাত্র মূল্যে বিশ্বমানের বিনোদন সুবিধা দেওয়ার প্রতীক ছিল এই পার্ক।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও শাহবাগের ঐতিহাসিক পরিসরে অবস্থিত হওয়ায় এটি বিনোদনের পাশাপাশি আমাদের তরুণ প্রজন্মকে ইতিহাস ও প্রকৃতির কাছাকাছি নিয়ে যেতে বিশেষ ভূমিকা রাখে।

খোলার সময়সূচি ও প্রবেশ মূল্য (হালনাগাদ তথ্য)

বর্তমান অবস্থা: পার্কটি আধুনিকায়ন ও মেগা প্রকল্পের কাজ চলায় বর্তমানে এটি সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।

পূর্ববর্তী/প্রস্তাবিত সময়সূচি

  • অক্টোবর থেকে মার্চ (শীতকালীন): দুপুর ১:০০ টা থেকে সন্ধ্যা ৭:০০ টা।
  • এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর (গ্রীষ্মকালীন): দুপুর ১:৩০ টা থেকে রাত ৮:০০ টা।
  • প্রতি বুধবার সাপ্তাহিক বন্ধ থাকত।
  •  
  • টিকিটের মূল্য: পূর্বে প্রবেশের জন্য নামমাত্র ১৫ টাকার টিকিট এবং রাইড প্রতি ১০ টাকার টিকিট ছিল। নতুন আধুনিক রূপ নিয়ে চালু হওয়ার পর সরকারি নীতিমালার আলোকে টিকিটের মূল্য পুনর্নির্ধারণ করা হবে।

বিশেষ দিবস

  • শিশু দিবস (১৭ই মার্চ): এই দিনে পার্কটিতে শিশুদের জন্য বিশেষ নানা আয়োজন থাকে।

  • ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা: ঈদের দিনগুলোতে পার্ক প্রাঙ্গণে লাখো শিশু ও অভিভাবকদের ঢল নামত।

  • পহেলা বৈশাখ ও আন্তর্জাতিক শিশু সপ্তাহ: বিশেষ ছুটির দিনে ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে পরিবারসহ সময় কাটানোর অন্যতম কেন্দ্র এটি।

কীভাবে যাবেন

শাহবাগ মোড়ে অবস্থিত হওয়ায় ঢাকার যেকোনো স্থান থেকে এখানে পৌঁছানো অত্যন্ত সহজ।

  • মেট্রোরেল ব্যবহার করে (সবচেয়ে সহজ): মেট্রোরেলে চড়ে সরাসরি ‘শাহবাগ’ স্টেশনে নামুন। স্টেশন থেকে নেমেই হাতের কাছে শিশু পার্কের প্রধান ফটক দেখতে পাবেন।

  • বাসে করে: ঢাকা শহরের যেকোনো স্থান (যেমন: মিরপুর, উত্তরা, ফার্মগেট, মতিঝিল, যাত্রাবাড়ী বা ধানমন্ডি) থেকে শাহবাগগামী যেকোনো বাসে উঠে ‘শাহবাগ মোড়’ বা ‘পিজি হাসপাতাল/BSMMU’-এর সামনে নামলেই পার্কের সামনে পৌঁছানো যায়।

অতিরিক্ত টিপস

  • আপডেট জেনে ভ্রমণ করুন: যেহেতু পার্কটির বড় ধরনের সংস্কার কাজ চলছে। তাই ভ্রমণের পরিকল্পনা করার আগে এটি সাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে কিনা বা বর্তমান আপডেট কী, তা জেনে নেওয়া ভালো।
  • আশেপাশের স্থান পরিদর্শনের সুযোগ: পার্কটি শাহবাগে হওয়ায় এটি বন্ধ থাকলেও আপনি এর ঠিক পাশেই অবস্থিত জাতীয় জাদুঘর, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, রমনা পার্ক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ঘুরে সময় কাটাতে পারেন।
  • নিরাপত্তা সচেতনতা: শাহবাগ মোড় অত্যন্ত জনবহুল ও ব্যস্ত এলাকা, তাই শিশুদের নিয়ে গেলে বা যান চলাচলের রাস্তা পার হওয়ার সময় বাড়তি সতর্ক থাকুন।