রমনা পার্ক – RAMNA PARK
রমনা পার্ক বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার বুক চিরে জেগে থাকা সবচেয়ে প্রাচীন, সুপরিচিত এবং পরিবেশগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক জাতীয় ঐতিহ্যবাহী উদ্যান। প্রায় ৬৮.৪৫ একর সুবিশাল এলাকা নিয়ে গঠিত এই উদ্যানটি কেবল একটি বিনোদন কেন্দ্র নয়। এটি ঢাকা শহরের অন্যতম প্রধান ‘ফুসফুস’ এবং বাংলা নববর্ষ উদযাপনসহ বাঙালির ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জাতীয় জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
ইতিহাস ও পরিচিতি
রমনা পার্কের ইতিহাস প্রায় চার শতক পুরনো। ১৬১০ সালে মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর যখন ঢাকাকে সুবা বাংলার রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করেন। তখন সুবাদার ইসলাম খান চিশতি এই এলাকায় বিশাল বাগান, প্রাসাদ এবং রেস্ট হাউস গড়ে তোলেন। ফার্সি শব্দ “রমনা” শব্দের অর্থ তৃণভূমি বা চারণভূমি। মুঘল আমলের পতন এবং কোম্পানি শাসনের প্রারম্ভে এটি জঙ্গল ও ঝোপঝাড়ে পরিণত হয়।
পরবর্তীতে ১৯ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ব্রিটিশ আমলে ঢাকার মেজিস্ট্রেট সি. এ. ডাউস এবং “ঢাকা কমিটি”-র উদ্যোগে স্থানটিকে পুনরায় পরিচ্ছন্ন করে পার্ক হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়। স্বাধীনতার পর গণপূর্ত অধিদপ্তরের (PWD) অধীনে রমনা পার্ককে একটি অত্যন্ত সুসংগঠিত, দৃষ্টিনন্দন ও উদ্ভিদ বৈচিত্র্যে ভরপুর আধুনিক জাতীয় উদ্যানে রূপান্তরিত করা হয়।
অবস্থান ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশ
-
অবস্থান: ঢাকার প্রাণকেন্দ্র শাহবাগ, হাইকোর্ট, মৎস্য ভবন এবং কাকরাইল এলাকার ঠিক মাঝামাঝি স্থানে এটি অবস্থিত।
-
পরিবেশ: বিস্তীর্ণ সবুজ ঘাসের মাঠ, হাজার হাজার সুউচ্চ প্রাচীন বৃক্ষরাজী এবং বিশাল এক প্রাকৃতিক লেক নিয়ে রমনা পার্কের পরিবেশ অত্যন্ত শান্ত ও শীতল।
উদ্ভিদ বৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সম্পদ
রমনা পার্ককে বলা চলে বিরল ও প্রাচীন উদ্ভিদের এক বিশাল জীবন্ত সংগ্রহশালা।
-
বিরল প্রজাতির বৃক্ষ: এখানে প্রায় ৫০০টিরও বেশি প্রজাতির হাজার হাজার গাছপালা রয়েছে। এর মধ্যে নাগলিঙ্গম, অশোক, কদম, বকুল, মহুয়া, রক্তকাঞ্চন, পাম, কামিনী, দেবদারু এবং শতবর্ষী সুবিশাল বট ও পাকুড় গাছ অন্যতম।
-
ঋতুভিত্তিক ফুলের সমারোহ: বসন্ত ও গ্রীষ্মে পুরো পার্ক সোনালু, কৃষ্ণচূড়া, জারুল এবং নাগলিঙ্গমের ফুলে রঙিন রূপ ধারণ করে। যা পুরো চত্বরকে এক মায়াবী আবহে ভরিয়ে তোলে।
-
বিশাল রমনা লেক: পার্কের ঠিক মাঝখান দিয়ে এঁকেবেঁকে প্রবাহিত হয়েছে সুবিশাল ও নান্দনিক রমনা লেক। লেকের ওপর রয়েছে ঝুলন্ত ও বাঁধানো ব্রিজ। যা দর্শনার্থীদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।
নাগরিক জীবন ও স্বাস্থ্যচর্চা
-
প্রাতঃভ্রমণকারীদের স্বর্গরাজ্য: প্রতিদিন ভোরে এবং বিকেলে হাজার হাজার প্রাতঃভ্রমণকারী, অ্যাথলেট এবং প্রবীণ নাগরিক উদ্যানে হাঁটতে ও শরীরচর্চা করতে আসেন। উদ্যানে নিয়মিত ব্যায়াম ও ইয়োগা করার জন্য বেশ কয়েকটি সুসংগঠিত ওয়াকওয়ে ও জিমনেসিয়াম গ্রুপ রয়েছে।
-
পরিবারের বিনোদন: শহরের কোলাহল ও যান্ত্রিকতা থেকে মুক্তি পেতে পরিবার, স্বজন ও শিশুদের নিয়ে নিরাপদ প্রাকৃতিক পরিবেশে সময় কাটানোর জন্য এটি অন্যতম সেরা স্থান।
পরিদর্শনের সময়সূচী ও নিয়মাবলী
-
খোলা থাকার সময়: সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য রমনা পার্ক প্রতিদিন ভোরে সূর্যোদয়ের সাথে সাথে উন্মুক্ত হয় এবং রাত ৯:০০ টা পর্যন্ত খোলা থাকে (নিয়মিত বিরতিতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ পরিচালনা করা হয়)।
-
প্রবেশ ফি: উদ্যানে প্রবেশ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে।
কিভাবে যাবেন?
ঢাকার যেকোনো প্রান্ত থেকে কাকরাইল, শাহবাগ বা মৎস্য ভবন মোড়ে এলেই খুব সহজে রমনা পার্কে পৌঁছানো যায়।
-
বাস/সিএনজি: যেকোনো জায়গা থেকে বাস বা সিএনজি যোগে সরাসরি শাহবাগ মোড়, মৎস্য ভবন, বা কাকরাইল মসজিদ এলাকায় নামলেই রমনা পার্কের একাধিক প্রবেশ গেট দেখতে পাবেন।
-
মেট্রোরেল (সবচেয়ে সহজ উপায়): ঢাকা মেট্রোরেলে ভ্রমণ করে সরাসরি “শাহবাগ মেট্রোরেল স্টেশন“ অথবা “বাংলাদেশ সচিবালয় মেট্রোরেল স্টেশন“ স্টেশনে নেমে মাত্র ২-৩ মিনিট হেঁটে সরাসরি রমনা উদ্যানের সুদৃশ্য ফটকে পৌঁছে যাওয়া সম্ভব।

