চন্দ্রিমা উদ্যান – CHANDRIMA UDYAN
চন্দ্রিমা উদ্যান (যা স্থানীয়ভাবে জিয়া উদ্যান নামেও পরিচিত) বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার শেরেবাংলা নগর এলাকায় অবস্থিত একটি অত্যন্ত সুপরিচিত, দৃষ্টিমনোরম ও ঐতিহাসিক পার্ক। বিস্তীর্ণ সবুজ চত্বর, সুবিশাল কৃত্রিম রদ (লেক), ঝুলন্ত সেতু এবং শান্ত পরিবেশের কারণে এটি ঢাকার অন্যতম সেরা ফুসফুস ও বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
ইতিহাস ও পরিচিতি
লুই কানের তৈরি জাতীয় সংসদ ভবন মাস্টারপ্ল্যানের সন্নিকটে অবস্থিত এই স্থানটির মূল ঐতিহাসিক রূপায়ণ ঘটেছিল সত্তরের দশকের শেষভাগে ও আশির দশকের শুরুতে। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর তাঁর সমাধি এই উদ্যানে স্থাপন করা হয়। যার ফলে সাধারণ মানুষের কাছে এটি দীর্ঘদিন “জিয়া উদ্যান” নামে সমধিক পরিচিত ছিল।
পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় আনুষ্ঠানিকভাবে এই পার্কের নাম পরিবর্তন করে “চন্দ্রিমা উদ্যান” রাখা হয়। বর্তমানে ইতিহাস, রাজনীতি এবং প্রকৃতির মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা এই উদ্যানটি জাতীয় গণপূর্ত অধিদপ্তরের অধীনে পরিচালিত ও রক্ষিত হয়।
অবস্থান ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশ
-
অবস্থান: ঢাকার তেজগাঁও, বিজয় সরণি ও শেরেবাংলা নগর এলাকায় জাতীয় সংসদ ভবনের ঠিক উত্তর পাশে এই উদ্যানটি অবস্থিত। এর একপাশে মিরপুর রোড, অন্যপাশে চন্দ্রিমা উদ্যান লেক এবং সংলগ্ন এলাকায় গণভবন ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তর রয়েছে।
-
পরিবেশ: প্রায় ৭৪ একর বিস্তৃত এলাকা নিয়ে গঠিত এই উদ্যানে রয়েছে হাজার হাজার ফলজ, বনজ ও ওষুধি গাছ। উদ্যানের লেক ও খোলা বাতাসের কারণে স্থানটি অত্যন্ত মনোরম ও শীতল।
স্থাপত্যশৈলী ও প্রধান আকর্ষণ
চন্দ্রিমা উদ্যানের নকশা অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ও দৃষ্টিনন্দন। এর মূল আকর্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে।
-
জিয়াউর রহমানের সমাধি কমপ্লেক্স: উদ্যানের কেন্দ্রে অবস্থিত সুদৃশ্য গম্বুজবিশিষ্ট মার্বেল পাথরের তৈরি বৃত্তাকার একটি কাঠামো। যেখানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সমাধি সংরক্ষিত রয়েছে।
-
মার্বেল পাথরের ঝুলন্ত সেতু (Suspension Bridge): উদ্যান চত্বরে প্রবেশের জন্য লেকের ওপর নির্মিত একটি নান্দনিক ঝুলন্ত সেতু রয়েছে। এটি পার হয়ে দর্শনার্থীরা মূল চত্বরে প্রবেশ করেন। উদ্যান ও লেকের পানি একসঙ্গে প্রতিফলিত হওয়ায় এই ব্রিজের দৃশ্য অত্যন্ত সুন্দর দেখায়।
-
বিশাল কৃত্রিম লেক: উদ্যানের কোল ঘেঁষে প্রবাহিত বিস্তৃত লেকটি পুরো চত্বরের সৌন্দর্য বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। লেকের পাড়ে বসে বিকেল কাটানো দর্শনার্থীদের কাছে অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।
-
সুসংগঠিত ওয়াকওয়ে ও বাগান: উদ্যানের ভেতরে সুবিশাল গোলাকার ওয়াকওয়ে বা হাঁটার পথ রয়েছে। যার দুপাশে নানা রঙের ফুল ও পাতাবাহার গাছের সাড়ি। নিয়মিত ব্যায়াম এবং প্রাতঃভ্রমণের জন্য এটি ঢাকার অন্যতম সেরা জায়গা।
সামাজিক ও নাগরিক গুরুত্ব
-
প্রাতঃভ্রমণ ও ব্যায়াম কেন্দ্র: ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, তেজগাঁও ও ফার্মগেট এলাকার হাজার হাজার স্বাস্থ্য সচেতন মানুষ প্রতিদিন ভোরবেলা এবং বিকেলে এখানে হাঁটতে ও ইয়োগা বা শারীরিক ব্যায়াম করতে আসেন।
-
পরিবার ও তরুণদের আড্ডা: সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে পরিবার, বন্ধু-বান্ধব ও শিশুদের নিয়ে সময় কাটানোর জন্য এটি একটি নিরাপদ ও আনন্দদায়ক উন্মুক্ত স্থান।
-
ছবি তোলার সেরা স্থান: আলোকচিত্রগ্রাহক বা ফটোগ্রাফারদের কাছে উদ্যানের লেক, ব্রীজ, সূর্যাস্ত এবং সংসদ ভবনের দূরবর্তী দৃশ্যের সুন্দর ফ্রেম ছবি তোলার জন্য খুবই জনপ্রিয়।
পরিদর্শনের সময়সূচী ও নিয়মাবলী
-
খোলা থাকার সময়: সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য চন্দ্রিমা উদ্যান প্রতিদিন সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত (সাধারণত সকাল ৬:০০ টা থেকে রাত ৯:০০ টা পর্যন্ত) উন্মুক্ত থাকে।
-
প্রবেশ ফি: উদ্যানে প্রবেশ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে।
কিভাবে যাবেন?
ঢাকার যেকোনো এলাকা থেকে চন্দ্রিমা উদ্যানে পৌঁছানো অত্যন্ত সুবিধাজনক।
-
বাস/সিএনজি: যেকোনো স্থান থেকে বাস বা সিএনজি যোগে সরাসরি বিজয় সরণি, অ্যাভিনিউ রোড বা চন্দ্রিমা উদ্যান মোড়ে নামলেই প্রধান ফটকে পৌঁছানো যায়।
-
মেট্রোরেল (সবচেয়ে সুবিধাজনক): ঢাকা মেট্রোরেলে ভ্রমণ করে সরাসরি “বিজয় সরণি (Bijoy Sarani) মেট্রোরেল স্টেশন“ স্টেশনে নামলে সেখান থেকে হেঁটে বা রিকশায় ১-২ মিনিটে সরাসরি চন্দ্রিমা উদ্যানের লেক ও ঝুলন্ত সেতু চত্বরে পৌঁছে যাওয়া সম্ভব।

